ডার্ক-ম্যাটার এবং ডার্ক-এনার্জি: w

এডউইন হ্যাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সিতে অবস্থিত একটি বিশেষ ধরণের নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ১৯২৯ সালে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে। যে গ্যালাক্সি যতো দূরে, তার দূরে চলে যাবার গতিও ততো বেশি। দূরত্বের সাথে গ্যালাক্সিগুলোর গতির এই সম্পর্ককে বলে হ্যাবল-ধ্রুবক, সঠিকভাবে হ্যাবল-প্যারামিটার। হ্যাবলের এই আবিষ্কারের মাধ্যমেই মহাকাশবিদরা নিশ্চিত হন যে, আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল।

deltacephei_lightcurve
সেফিয়েড-ভ্যারিয়েবল নক্ষত্রদের উজ্জ্বলতা এবং স্থায়িত্বের সম্পর্ক।

হ্যাবল যে বিশেষ নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তাদের বলা হয়, সেফিয়েড-ভ্যারিয়েবল (Cepheid variable)। সেফিয়েড-ভ্যারিয়েবলদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, সময়ের সাথে সাথে এদের উজ্জ্বলতা ওঠা-নামা করে। ১৯১২ সালের হেনরিয়েটা লেভিট (Henrietta Swan Leavitt) সেফিয়েড-ভ্যারিয়েবলদের উজ্জ্বলতার সাথে উজ্জ্বলতার-স্থায়িত্বের গাণিতিক সম্পর্ক বের করেন। অর্থাৎ, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যদি কোনো সেফিয়েড-ভ্যারিয়েবলের উজ্জ্বলতার-স্থায়িত্ব নির্ণয় করা যায়,
তবে গাণিতিকভাবে ঐ সেফিয়েড-ভ্যারিয়েবলের সহজাত উজ্জ্বলতা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। এই সহজাত উজ্জ্বলতা এবং পর্যবেক্ষিত উজ্জ্বলতার ব্যবধান থেকে নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব নির্ণয় করা সম্ভব। হ্যাবল এই পদ্ধতিতেই মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলার ধারণাতে উপনীত হন।

dwarf
বাইনারি-সিস্টেমের শ্বেত-বামন তার সঙ্গী নক্ষত্রকে গিলে খাচ্ছে।

সমস্যা হলো, যে কোনো নক্ষত্রই মহাজাগতিক দূরত্বের তুলোনায় যথেষ্ট উজ্জ্বল নয়। তাই বহু দূরের গ্যালাক্সিগুলোর গতি সেফিয়েড-ভ্যারিয়েবল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানে ব্যবহার করা হয়, টাইপ-১এ সুপারনোভা। টাইপ-১এ সুপারনোভা ঘটায় শ্বেত-বামনেরা। একটি শ্বেতবামনের ভর ১.৪৪ সৌরভরের কম। এই ১.৪৪ সৌরভর সীমাকে বলে চন্দ্রশেখর-সীমা। বাইনারি-সিস্টেমের থাকা শ্বেত-বামনেরা তাদের সঙ্গী নক্ষত্রকে ধীরে ধীরে গিলে খেতে থাকে। এই খাদকদের ভর যখন চন্দ্রশেখর-সীমা অতিক্রম করে, তখন অতিরিক্ত ভর শ্বেত-বামনেরা টাইপ-১এ সুপারনোভার মাধ্যমে বের করে দেয়। সব টাইপ-১এ সুপারনোভার উজ্জ্বলতা একইরকম নয়। যে টাইপ-১এ য়ের উজ্জ্বতা বেশি তার স্থায়িত্বও বেশি। সেফিয়েড-ভ্যারিয়েবলের মতোই টাইপ-১এ য়ের উজ্জ্বতার সাথে তাদের স্থায়িত্ব-কালের গাণিতিক সম্পর্ক রয়েছে। টাইপ-১এ য়ের বৈশিষ্ট্য হলো, এরা প্রচন্ড উজ্জ্বল, কখনো কখনো এদের উজ্জ্বলতা তাদের মূল গ্যালাক্সির সম্মিলিত উজ্জ্বলতাকে ছড়িয়ে যায়। তাই ভূমিতে অবস্থিত টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বহু দূরের গ্যালাক্সিগুলোর টাইপ-১এ সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করা যায়। এই সুপারনোভাগুলোর উজ্জ্বলতার স্থায়িত্ব থেকে সুপারনোভাগুলোর সহজাত-উজ্জ্বলতাকে গাণিতিকভাবে নির্ণয় করা হয়। আর এই সহজাত-উজ্জ্বলতা এবং পর্যবেক্ষিত উজ্জ্বলতার ব্যবধান থেকে সুপারনোভা এবং তাদের গ্যালাক্সিদের দূরত্ব নির্ণয় করা যায়। এইজন্যই টাইপ-১এ সুপারনোভাদের বলা হয় মহাবিশ্বের স্ট্যান্ডার্ড-ক্যান্ডেল বা আদর্শ-বাতি

১৯২৯ সালে হ্যাবল মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতার কথা বলছিলেন ঠিকই, কিন্তু এই সম্প্রসারণশীলতার ধরণ ব্যাখ্যা করেননি। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতার কি সময়ের সাথে সাথে কমছে নাকি বাড়ছে, সেটা হ্যাবলের জানা ছিলো না। এই তথ্যটি পাওয়া যায় ১৯৯৮ সালে। দূরবর্তী গালাক্সিদের টাইপ-১এ সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ১৯৯৮ সালে দুটি গবেষকদল সম্পূর্ণ আলাদা আলাদাভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, সময়ের সাথে সাথে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা বাড়ছে। এই দুই দলের একটির নেতৃত্বে ছিলেন সল-পার্লমাটার (Saul Perlmutter) অন্যটির নেতৃত্বে ছিলেন ব্রায়ান-স্মিড (Brian Schmidt)।

হ্যাবলের মহাবিশ্বের সম্পসারণশীলতা আবিষ্কারের পরপরই একটা প্রচলিত ধারণা ছিলো যে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা ধীরে ধীরে কমছে। তাই ১৯৯৮ সালে এই সম্প্রসারণশীলতার-ত্বরিতগতি আবিষ্কারের ব্যাপারটা ছিলো একেবারেই অপ্রত্যাশিত। যে কোনো ত্বরণের জন্যই শক্তির প্রয়োজন। তাই প্রশ্ন হলো, মহাবিশ্ব তার ত্বরিত সম্প্রসারণশীলতার জন্য দরকারি শক্তি পাচ্ছে কোত্থকে?

স্ট্যান্ডার্ড-ক্যান্ডেল ব্যবহারের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা নির্ণয় করা হয়, যেটা ফ্রীডম্যানের সমীকরণের H বা হ্যাবল-প্যারামিটার। অন্যদিকে, একই সমীকরণের K বা মহাবিশ্বের বক্রতা নির্ণয় করা হয় স্ট্যান্ডার্ড-রুলার বা আদর্শ-দৈর্ঘ্যমাপনী। সমস্যা হলো, মহাবিশ্বের এমন কোনো কাঠামো নেই যাকে এই স্ট্যান্ডার্ড-রুলার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাই K য়ের মান নির্ণয় করা হয় ভিন্ন ভাবে।

রিকম্বিশনের সময় কিছু কিছু BAO বা ব্যারিয়নিক-একুইস্টিক-অসিলেশন সংকুচিত অবস্থায় ছিলো। যারা পরবর্তীতে সম্প্রসারণের কোনো সুযোগই পায়নি। এই BAO গুলো ছিলো রিকম্বিশনের সময় মহাবিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চল। এই উত্তপ্ত অঞ্চলগুলোর সাথে তাদের আশেপাশের অঞ্চলগুলোর তাপমাত্রার তারতম্য ছিলো সবচেয়ে বেশি। রিকম্বিশনের সাথে সাথে CMBয়ের মাধ্যমে এই তাপমাত্রার-তারতম্য (Temperature fluctuation) মহাবিশ্বের ছড়িয়ে পড়ে। রিকম্বিনেশন ঘটে বিগ-ব্যাংয়ের তিনলক্ষ আশিহাজার (বা প্রায় চারলক্ষ) বছর পর। তাই মহাবিশ্বে ঐ উত্তপ্ত অঞ্চলগুলোর বর্তমান আকার প্রায় চারলক্ষ আলোকবর্ষ। চারলক্ষ আলোকবর্ষ বিস্তৃত এই ফসিল-উত্তপ্ত অঞ্চলগুলো হলো মহাবিশ্বের স্ট্যান্ডার্ড-রুলার, যেটা CMBয়ের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়। মহাবিশ্ব যদি সমতল বা বক্রতাশূন্য হয় তবে, আমাদের বর্তমান অবস্থান থেকে এই স্ট্যান্ডার্ড-রুলারগুলোকে একডিগ্রী কোণে পাওয়ার কথা। স্ট্যান্ডার্ড-রুলারগুলো যদি একডিগ্রীর কম হয় তবে মহাবিশ্বের বক্রতা ঋণাত্মক, এবং বেশি হলে বক্রতা ধনাত্মক। প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি, WMAP স্যাটেলাইট প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে CMB য়ের তাপমাত্রার-তারতম্যগুলোর আকার প্রায় একডিগ্রী। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সমতল, এবং Kয়ের মান শূন্য।

spacetime-1
দূরবর্তী স্ট্যান্ডার্ড-রুলারকে বর্তমান অবস্থান থেকে কেমন দেখাবে তার কাল্পনিক চিত্র। বাঁয়ে: ধনাত্মক-বক্রতা, মাঝে: ঋণাত্মক-বক্রতা, ডানে: শূন্য-বক্রতা।

H এবং Kয়ের মান বসালে ফ্রীডম্যান সমীকরণ থেকে ρ বা বস্তু-ঘনত্ব পাওয়া যায়। এই ρ বলে অপরিহার্য-ঘনত্ব (Critical density)। অপরিহার্য-ঘনত্ব এবং পরিমাপকৃত-ঘনত্বের অনুপাতকে বলে, Ω। অর্থাৎ, Ω = পরিমাপকৃত-ঘনত্ব/অপরিহার্য-ঘনত্ব। সমতল মহাবিশ্বের জন্য দরকার Ω = ১। কিন্তু, সমস্ত সাধারণ এবং ডার্ক-ম্যাটার মিলিয়ে Ω দাঁড়ায় ০.৩তে, যেটা দরকারের চেয়ে ০.৭ কম। একসময় ধারণা করা হতো যে, এই নিরূদ্দেশ ০.৭ অংশটি আমরা কোনো একদিন পদার্থ হিসেবে খুঁজে পাবো। কিন্তু, কয়েক দশকের খোঁজাখুঁজির পর আজ আমরা নিশ্চিত, এই ০.৭ অংশটি কণা দিয়ে তৈরি কোনো ধরণের পদার্থ বা বিকিরণ হতে পারে না।

spacetime-2
আইনস্টাইনের মূল সমীকরণ।

আইনস্টাইনের মূল সমীকরণের দিকে তাকানো যাক। ডানের টেন্সরটি মহাবিশ্বের সমস্ত ভরবেগের সমষ্টি (Energy momentum tensor), এবং বাঁয়ের অংশটি এই ভরবেগের কারণের স্থানকালের বক্রতা নির্দেশ করে। এই ভরবেগের টেন্সরটি দুটি অংশে বিভক্ত।

মোট ভরবেগ = শক্তিঘনত্ব + (৩ x চাপ)

ফ্রীডম্যানের সমীকরণ থেকে আমরা জানি, আইনস্টাইনের স্থানকালের বক্রতা দুই ধরণের হতে পারে।

(এক) জ্যামিতিক-বক্রতা: যেটা K দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এই বক্রতার কারণ শক্তিঘনত্ব। আইনস্টাইনের বিশেষ-আপেক্ষিকতা অনুসারে “ভর” “শক্তির” ভিন্ন রূপ। তাই এই শক্তিঘনত্ব “ভর” এবং “শক্তি” দুটোই নির্দেশ করে।

(দুই) সম্প্রসারণশীলতা/সংকোচনশীলতা: এটা H দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এই বক্রতার কারণ ভরবেগ টেন্সরের “চাপ” অংশটি। চাপের সাথে তিন সংখ্যাটি গুণ হবার কারণ হলো, আইনস্টাইনের স্থান-ত্রিমাত্রিক, চতুর্মাত্রিক স্থানের ক্ষেত্রে চাপ চারগুণ হতো, ইত্যাদি।”শক্তি” স্থানকালে জ্যামিতিক-বক্রতা দিতে চায়, কিন্তু “চাপ” স্থানকালকে প্রসারিত করতে চায়।দেখাই যাচ্ছে যে, “চাপ” পরিমাণে “শক্তির” তিনগুণ। তাই, আইনস্টাইনের মহাবিশ্বের “শক্তি” বনাম “চাপের” যুদ্ধের কোনো এক পর্যায়ে চাপের জয় হবার কথা।

আইনস্টাইনের মূল সমীকরণের বাঁয়ে বক্রতা নির্দেশক অংশের যে R রয়েছে, তাকে বলে মহাবিশ্বের স্কেল-ফ্যাক্টর। R বা স্কেল-ফ্যাক্টর একটি মাত্রাবিহীন সময়-নির্ভর পরিমাপ। স্কেল-ফ্যাক্টর সময়ের সাথে সাথে মহাবিশ্বের আপেক্ষিক আকার নির্দেশ করে। যেমন, রিকম্বিনেশনের সময় মহাবিশ্বের স্কেল-ফ্যাক্টর ছিলো বর্তমান আকারের একহাজারভাগের একভাগ। মহাবিশ্বেরস্কেল-ফ্যাক্টর বাড়ার সাথে সাথে বিকিরণ, পদার্থ (সাধারণ এবং ডার্ক-ম্যাটার), এবং জ্যামিতিক-বক্রতার হ্রাসের হার নিচের সম্পর্ক থেকে পাওয়া যায়:

জ্যামিতিক-বক্রতার হ্রাসের হার = ১/(স্কেল-ফ্যাক্টর)^২
পদার্থ ঘনত্ব হ্রাসের হার = ১/(স্কেল-ফ্যাক্টর)^৩
বিকিরণ শক্তি হ্রাসের হার = ১/(স্কেল-ফ্যাক্টর)^৪

এথেকে দুটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়;

প্রথমত, মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের সাথে সাথে সবচেয়ে দ্রুত শক্তি হারাতে থাকে বিকিরণ, এরপর পদার্থ, আর সবচেয়ে ধীরে জ্যামিতিক-বক্রতার। আগেই বলা হয়েছিলো, জ্যামিতিক-বক্রতার কারণ পদার্থ এবং বিকিরণ ঘনত্ব। মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের সাথে সাথে জ্যামিতিক-বক্রতার তুলোনায় পদার্থ এবং বিকিরণের ঘনত্ব হ্রাসের হার দ্রুত। তাই, শুধুই পদার্থ এবং বিকিরণ হিসেবে আনলে মহাবিশ্বের বর্তমান আকার বা স্কেল-ফ্যাক্টরে স্থানকালের জ্যামিতিক-বক্রতা শূন্য বা সমতল হওয়া সম্ভব নয়।এই সমস্যাকে বলে ফ্ল্যাটনেস-সমস্যা (Flatness problem)।

দ্বিতীয়ত, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বিগ-ব্যাংয়ের পরপরই মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ছিলো বিকিরণ নির্ভর। বিকিরণ শক্তি ঘনত্ব কমে আসলে এই সম্প্রসারণ প্রভাবিত হয় পদার্থের মাধ্যমে। আমাদের জানা মতে,মহাবিশ্বের স্কেল-ফ্যাক্টর যতোক্ষণ পর্যন্ত বর্তমানের অর্ধেক ছিলো, ততোক্ষণ সাধারণ-পদার্থ এবং ডার্ক-ম্যাটার যৌথভাবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণকে ধীর করে দিয়েছিলো। বিকিরণ এবং পদার্থ নির্ভর হওয়াতে এই সময় পর্যন্ত স্থানকালের জ্যামিতিক-বক্রতা শূন্য হওয়ার কথা নয়। কিন্তু, অর্ধেক স্কেল-ফ্যাক্টর পার হবার পরপরই পদার্থের ঘনত্ব “চাপের” তুলোনায় হ্রাস পায়, এবং “চাপ” মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। আমরা যদি অন্যান্য মহাজাগতিক সংখ্যাগুলো দেখি, সেগুলো হিসেব করতে হয় বিলিয়ন পরিমাপে। কিন্তু, পর্যবেক্ষিত চাপ মোট শক্তিঘনত্বের মাত্র দুই থেকে তিনগুণ। যেটা ইঙ্গিত করে, মহাবিশ্বে “চাপের” প্রাধান্যতা একটি অতিসম্প্রতিক ব্যাপার। অর্থাৎ, আমরা এমন একসময়ে মহাবিশ্বকে পরিমাপ করছি যখন স্থানকাল সবে সমতল হয়েছে মাত্র। মহাবিশ্ব সমতল হবার পরপরই আমাদের আবির্ভাবের ব্যাপারটিকে বলে কোইন্সিডেন্স-স্ক্যান্ডাল (Coincidence scandal)।

আইনস্টাইনের সমীকরণ থেকে পাওয়া এই “চাপকে” ব্যাখ্যা করার জন্যই ডার্ক-এনার্জি শব্দটার প্রবর্তন করা হয়েছে। ডার্ক-এনার্জি সম্পর্কে আমরা যা জানি সেটা হলো, ডার্ক-এনার্জি স্থানকাল জুড়ে মসৃনভাবে বিস্তৃত। এবং মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের সাথে সাথে বিকিরণ বা পদার্থের মতো  ডার্ক-এনার্জির পরিমাণ হ্রাস পায় না। শেষের অংশটুকুতে খটকা লাগতে পারে। কারণ ডার্ক-এনার্জি যদি স্থানকালের অংশ হয়ে থাকে, এবং এর পরিমাণ যদি হ্রাস না পায়, তবে স্থানকালের সম্প্রসারণশীলতার সাথে সাথে  ডার্ক-এনার্জি পরিমাণও বাড়তে থাকবে। অর্থাৎ, মনে হতে পারে যে, ডার্ক-এনার্জির ক্ষেত্রে শক্তির নিত্যতার নীতিটি প্রযোজ্য নয়।

প্রথমপর্বে বলা হয়েছিলো যে, নিউটনের স্থানকালে সময় “পরম” (Absolute)। এই কারণেই নিউটনের মহাবিশ্বে বিভিন্ন ভৌত-প্রক্রিয়াগুলো সময়ের সাথে সাথে অপরিবর্তিত থাকে। এই ব্যাপারটিকে বলে, টাইম-ট্রান্সলেশন-ইনভ্যারিয়েন্স। এই টাইম-ট্রান্সলেশন-ইনভ্যারিয়েন্স গাণিতিকভাবে প্রমাণিত করেন, এমি-নেদার (Emmy Noether)। এমি-নেদারের গাণিতিক প্রমাণকে বলে নেদার-থিওরেম (Noether theorem)। নেদার-থিওরেম থেকে নিউটনের মহাবিশ্বের একটি মৌলিক প্রতিসাম্যতা পাওয়া যায়, যাকে আমরা “শক্তির নিত্যতা নীতি” বলি। আইনস্টাইনের মহাবিশ্বে সময় “স্থানীয়” (Local)। আর তাই, আইনস্টাইনের সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বে নিউটোনিয়ান “শক্তির নিত্যতা নীতি” প্রযোজ্য নয়।

প্রকৃতিগতভাবে ডার্ক-এনার্জি দুটি ধরণের হতে পারে; অপরিবর্তনশীল (Static) এবং পরিবর্তনশীল (Dynamic)। 

অপরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জির ক্ষেত্রে, স্থানকালের প্রতি ঘন একক আয়তনে ডার্ক-এনার্জির পরিমাণ স্থির থাকে। প্রশ্ন হতে পারে, স্থির শক্তির ডার্ক-এনার্জি কিভাবে স্থানকালের ত্বরণ বা ত্বরিত-সম্প্রসারণ ঘটাতে পারে? আইনস্টাইনের সমীকরণটির ভিত্তি রেইমেনিয়ান-জ্যামিতি। এই জ্যামিতির একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অপরিবর্তনশীল-বল পরিবর্তনশীল-বেগ বা ত্বরণ ঘটাতে পারে। হ্যাবলের সমীকরণ v=Hd; অনুসারে দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে বেগ বাড়ে, এবং বেগ বাড়ার সাথে সাথে দূরত্ব বাড়ে। এই চক্রাকার সম্পর্কের কারণে, Hয়ের যেকোনো স্থির মানের জন্য মহাবিশ্বের ত্বরিত সম্প্রসারণ ঘটবে। অপরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জির দৃষ্টিতে এর ব্যাখ্যা হলো, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণে স্থানকালের আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও নতুন অঞ্চলগুলোর শক্তি অন্যান্য অঞ্চলগুলোর সমান। কিন্তু আকার বৃদ্ধি কারণের স্থানকালের মোট শক্তি পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর এই বাড়তি শক্তি মহাবিশ্বের সম্প্রসারণকে দ্রুততর করছে।

অপরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হলো, শূন্যস্থানের-শক্তি বা ভ্যাকুয়াম-এনার্জি। হেইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার-নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অসমতা হলো, ∆t * ∆E ≥ ħ/2; এই অসমতা অনুসারে, অতিক্ষুদ্র সময়ে স্থানকালের শক্তির পরিমাণ নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। এই অনিশ্চয়তার-নীতির কারণে, স্থানকালের কোনো শূন্যস্থানে আমাদের পরিচিত কোয়ান্টাম-বলক্ষেত্রগুলোর মান শূন্য হতে পারে না। আর তাই, শূন্যস্থানে প্রতিনিয়ত তৈরি হয় অসংখ্য ভার্চুয়াল-কণা; যেমন: ভার্চুয়াল-ফোটন, ভার্চুয়াল-ইলেক্ট্রন, ভার্চুয়াল-কোয়ার্ক, ইত্যাদি। এই ভার্চুয়াল-কণাগুলোর শক্তিই হলো ভ্যাকুয়াম-এনার্জি। স্থানকালে এই ভার্চুয়াল-কণাগুলো এক মুহূর্তে প্রকাশ পায় এবং পরের মুহূর্তেই হারিয়ে যায়, তাই লম্বা সময়ে এদের গড় শক্তি শূন্য। ভ্যাকুয়াম-এনার্জি কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টে সাধারণ-কণাদের ওপর ভার্চুয়াল-কণাদের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। মাধ্যাকর্ষণ এবং সকল কোয়ান্টাম-বলক্ষেত্র হিসাবে আনলে আমরা গাণিতিকভাবে ভ্যাকুয়াম-এনার্জির মান পাই, ১০^১১২ আর্গ/ঘনসেন্টিমিটার। কিন্তু, পর্যবেক্ষিত মান হলো, ১০^(-৮) আর্গ/ঘনসেন্টিমিটার, যেটা প্রত্যাশিত মানের ১০^১২০ গুণ কম। এই গড়মিলকে বলে কসমোলজিক্যাল-কনস্ট্যান্ট-প্রবলেম। ডার্ক-এনার্জি হিসেবে ভ্যাকুয়াম-এনার্জিকে  প্রস্তাব করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এই কসমোলজিক্যাল-কনস্ট্যান্ট-প্রবলেম। আর, ১০^(-১২০) সংখ্যাটিকে বলে, Λ (ল্যামডা) বা মহাজাগতিক-ধ্রুবক বা কসমোলজিক্যাল-কনস্ট্যান্ট

অন্যদিকে, পরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জির একাধিক প্রার্থী রয়েছে। একটি পুরোনো কিন্তু জনপ্রিয় প্রার্থী হলো, কুইনটেসেন্স-বলক্ষেত্র (Quintessence field), কুইনটেসেন্স-বলক্ষেত্র একটি স্কেলার-বোসন ধরণের কোয়ান্টাম-বলক্ষেত্র। স্কেলার বোসনদের বৈশিষ্ট্য হলো, এদের প্রয়োগকৃত বলের কোনো দিক থাকেনা। হিগ্গস এমনই একটি বলক্ষেত্র।  হিগ্গস-বলক্ষেত্র সাথে এর মূল পার্থক্য হলো, হিগ্গস-বলক্ষেত্রের বিকাশ ঘটে অত্যন্ত দ্রুত, কিন্তু কুইনটেসেন্স-বলক্ষেত্রের বিকাশ ঘটে অত্যন্ত ধীরে। কুইনটেসেন্স কণারা ফোটন বা গ্র্যাভিটনের মতো হালকা এবং লম্বা দূরত্বে বল প্রয়োগ করতে পারে, এইজন্যই কুইনটেসেন্সকে বলে প্রকৃতির-পঞ্চম-বল (Fifth force of nature)। সমস্যা হলো, কুইনটেসেন্সের অস্তিত্ব থাকলে আমরা তার প্রভাব মহাবিশ্বের অন্যান্য কণার ওপর দেখতে পেতাম। ধারণা করা হয় যে, বিগ-ব্যাংয়ের পরপরই অন্যান্য কোয়ান্টাম-বলক্ষেত্রের মতোই কুইনটেসেন্সের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে থাকে। কিন্তু, অজ্ঞাত কোনো কারণে মহাবিশ্বে গ্যালাক্সির মতো কাঠামো তৈরি হবার সময় এর বিকাশ মন্থর হয়ে পড়ে।

ভিন্ন একটি পরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জির প্রার্থী ফ্যান্টম-এনার্জি (Phantom energy)। ফ্যান্টম-এনার্জি মডেল অনুসারে, হালকা কণারা নিউক্লিয়ার-ক্ষয়ের মাধ্যমে ভারী কণায় পরিণত, আর এই প্রক্রিয়ায় ঋণাত্মক শক্তি নির্গত হয়। সমস্যা হলো, প্রকৃতিতে এই ধরণের নিউক্লিয়ার-ক্ষয় কখনো দেখা যায়নি। ফ্যান্টম-এনার্জি হলো কুইনটেসেন্সের ঠিক উল্টো। কুইনটেসেন্সের যেখানে অতি ধীরে কমতে থাকে, সেখানে ফ্যান্টম-এনার্জি বাড়তে থাকে দ্রুত। ফ্যান্টম-এনার্জি ধারণাটি যদি সত্য হয়, তবে মহাবিশ্বে ডার্ক-এনার্জি এক পর্যায়ে এতো বেশি হবে যে, পুরো মহাবিশ্ব একটি সিঙ্গুলারিটিতে পরিণত হবে। অর্থাৎ,  ফ্যান্টম-এনার্জি মডেল অনুসারে মহাবিশ্বের শুরু এবং শেষ সিঙ্গুলারিটিতে, মহাবিশ্বের এই পরিণতিকে বলে বিগ-রিপ (Big Rip)।

তৃতীয় পরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জি মডেলটি হলো, ট্যাংগেল্ড-স্ট্রিং। ট্যাংগেল্ড-স্ট্রিং অনুসারে, মহাবিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত জুড়ে রয়েছে একাধিক মহাজাগতিক-তন্তু বা কসমিক-স্ট্রিং। এই কসমিক-স্ট্রিং মোটেও স্ট্রিং-তত্ত্বের স্ট্রিং নয়। এই কসমিক-স্ট্রিংগুলো খুব কম শক্তির, তাই এদের দেখা যায় না। এই কসমিক-স্ট্রিংগুলো যদি ঘটনাক্রমে একে অন্যের সাথে পেঁচিয়ে যায়, তখন এই পেঁচানো কসমিক-স্ট্রিংগুলোর শক্তি বিকশিত হতে থেকে অত্যন্ত ধীর গতিতে।

সবচেয়ে কম জনপ্রিয় পরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জি মডেলটি হলো, VAMP (Variable mass particles)। VAMP মডেল অনুসারে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে পদার্থ-কণাদের ভর বাড়তে থাকে। এই ভর বাড়ার কারণ হলো, কোনো অজ্ঞাত স্কেলার-বলক্ষেত্রে প্রভাব। সমস্যা হলো, আমাদের পর্যবেক্ষণকৃত তথ্য অনুসারে, বিগ-ব্যাং-নিউক্লিয়োসিন্থেসিস থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন কণাদের ভর অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই, VAMP মডেলটি প্রয়োগ করা হয় ডার্ক-ম্যাটার কণাদের ওপর। VAMP অনুসারে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে কণাদের ঘনত্ব কমে যায়, কিন্তু কণাদের ভর বাড়তে থেকে। আর এই বাড়তি ভর ডার্ক-এনার্জির মতোই কাজ করে।

পরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জির ধারণাগুলোর সমস্যা হলো, এইসব কোয়ান্টাম-বলক্ষেত্রের প্রভাবে আমাদের বহু পরিচিত কণাদের চার্জ, ভর, ইত্যাদির মতো ধ্রুবকগুলোর পরিবর্তন ঘটার কথা। কিন্তু, পরিবর্তনশীল-ডার্ক-এনার্জির বিকাশ যদি মহাবিশ্বের অতিসম্প্রতিক কোনো ঘটনা হয়, এবং এর বিকাশ যদি অতিমন্থর গতিতে ঘটে, তবে প্রকৃতির ধ্রুবকগুলোর পরিবর্তন লক্ষ্য করার জন্য প্রচুর সময়ের দরকার।

মহাবিশ্বে ডার্ক-এনার্জি পরিবর্তনশীল নাকি অপরিবর্তনশীল, সেটা নির্ণয় করার জন্য একটি প্যারামিটার ব্যবহার করা হয়, যার নাম; w বা ইকুয়েশন-অফ-স্টেট-প্যারামিটার। আমরা দেখেছিলাম যে, আইনস্টাইনের সমীকরণে “চাপ” “শক্তিঘনত্বের” তিনগুণ, এবং এই “চাপ” “শক্তিঘনত্বের” বিপরীতে কাজ করে। তাই, ডার্ক-এনার্জিকে ঋণাত্মক-চাপ বলে।বস্তুত ডার্ক-এনার্জি একটি ঋণাত্মক শক্তি, আর এই ঋণাত্মক সূচক -১ হলো w।

যদি, wয়ের মান যদি -১য়ের চেয়ে বেশি হয়; যেমন: -০.৮ বা -০.৭ ইত্যাদি, তবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতার সাথে সাথে ডার্ক-এনার্জির বিকাশ করে কমে যাবে, যেটা কুইনটেসেন্স-বলক্ষেত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি, wয়ের মান যদি -১য়ের চেয়ে কম হয়, যেমন -১.১ বা -১.২ ইত্যাদি, তবে ডার্ক-এনার্জির বিকাশ করে বেড়ে যাবে, যেটা ফ্যান্টম-এনার্জির দিকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু, wয়ের মান যদি -১য়ের সমান হয়, তবে ডার্ক-এনার্জি হবে অপরিবর্তনশীল, এক্ষেত্রে ভ্যাকুয়াম-এনার্জিই একমাত্র প্রার্থী। আমাদের মহাবিশ্বে এই wয়ের পর্যবেক্ষণকৃত মান প্রায় -১। সমস্যা হলো, প্রান্তিক ত্রুটির পরিমাণ অনেক বেশি প্রায়, ±০.৩। অর্থাৎ,  wয়ের পর্যবেক্ষণকৃত মান -০.৭ থেকে -১.৩ এর মধ্যে। সঠিক সিদ্ধান্তে আসার জন্য wয়ের আরো নিখুঁত পরিমাপ দরকার। তাই প্রান্তিক ত্রুটির পরিমাণ ±০.০৫তে নিয়ে আসার লক্ষ্যে প্রচুর গবেষণা চলছে।

আগের পর্ব: ডার্ক-ম্যাটার
পরের পর্ব: ইনফ্লেশন

অবলম্বনে: “The Great Courses” থেকে প্রকাশিত “Dark Matter, Dark Energy: The Dark Side of the Universe” by “Sean Carroll”